অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা কী?-
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা বলতে বোঝায় যখন গর্ভাশয়ের (uterus) সামনের দিকে বা পেটের দিকের দেয়ালে প্লাসেন্টা অবস্থান করে। সাধারণত প্লাসেন্টা গর্ভাশয়ের পিছনের দেয়ালে (posterior wall) অবস্থান করে, তবে অনেক সময় এটি সামনের দেয়ালেও তৈরি হতে পারে। এটি স্বাভাবিক একটি অবস্থা, যা সাধারণত গর্ভবতী নারীর ও শিশুর জন্য ক্ষতিকর নয়।
প্লাসেন্টা হলো এমন একটি অঙ্গ যা শিশুকে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে এবং বর্জ্য পদার্থ শরীর থেকে বের করে দেয়। তাই প্লাসেন্টার অবস্থান গর্ভাবস্থার স্বাভাবিক বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা কিভাবে জানা যায়?-
গর্ভাবস্থার প্রায় ১৮ থেকে ২২ সপ্তাহে করা আলট্রাসাউন্ড স্ক্যানের মাধ্যমে অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা নির্ণয় করা যায়। ডাক্তার আলট্রাসাউন্ড রিপোর্টে প্লাসেন্টার অবস্থান উল্লেখ করে দেন — anterior, posterior, fundal বা low-lying ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে।
যদি রিপোর্টে “anterior placenta” লেখা থাকে, তার মানে হলো প্লাসেন্টা গর্ভাশয়ের সামনের দিকে অবস্থান করছে।
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টার কারণ কী?-
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। এটি স্বাভাবিকভাবে ঘটে এবং প্লাসেন্টা কোথায় যুক্ত হবে তা মূলত ডিম্বাণুর অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। তবে কিছু বিষয় এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন:
- পূর্বে সিজারিয়ান বা গর্ভাশয়ে অস্ত্রোপচার হয়ে থাকলে
- জরায়ুর গঠন ভিন্ন হলে
- একাধিক গর্ভাবস্থা (যমজ বা ত্রয়ী) থাকলে
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টার লক্ষণ বা উপসর্গ-
সাধারণত অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা থাকলেও কোনো বিশেষ উপসর্গ দেখা যায় না। তবে কিছু নারী নিচের বিষয়গুলো লক্ষ্য করতে পারেন:
- শিশুর নড়াচড়া (baby movement) একটু দেরিতে অনুভব হওয়া
- প্রথম দিকে কিক বা নড়াচড়া কম টের পাওয়া
- মাঝে মাঝে হালকা ব্যথা বা ভারী লাগা অনুভব করা
তবে এগুলো স্বাভাবিক এবং অধিকাংশ সময় চিন্তার কিছু থাকে না।
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টার ঝুঁকি-
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা সাধারণত বিপজ্জনক নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি কিছু জটিলতা তৈরি করতে পারে।
১. শিশুর নড়াচড়া বোঝা কঠিন হতে পারে:
প্লাসেন্টা সামনের দেয়ালে থাকায় এটি একধরনের কুশন হিসেবে কাজ করে। ফলে শিশুর লাথি বা নড়াচড়া টের পেতে দেরি হতে পারে।
২. সিজারিয়ান সেকশন (C-section) জটিলতা:
যদি প্লাসেন্টা নিচের দিকে চলে আসে (anterior low-lying placenta বা placenta previa), তাহলে ডেলিভারির সময় রক্তক্ষরণ বা সিজারিয়ান প্রয়োজন হতে পারে।
৩. আলট্রাসাউন্ডে অসুবিধা:
শিশুর অবস্থান ও হার্টবিট স্পষ্ট দেখা কঠিন হতে পারে, কারণ প্লাসেন্টা আলট্রাসাউন্ডে কিছুটা বাধা দেয়।
৪. রক্তপাতের ঝুঁকি:
বিরল ক্ষেত্রে anterior placenta আংশিকভাবে ছিঁড়ে গেলে হালকা রক্তপাত হতে পারে। এ অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়।
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা এবং শিশুর নড়াচড়া-
অনেক মা উদ্বিগ্ন হন কারণ অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা থাকলে শিশুর নড়াচড়া টের পেতে কিছুটা সময় লাগে। সাধারণত ২০ সপ্তাহের পর নড়াচড়া স্পষ্ট বোঝা শুরু হয়।
তবে এটি শিশুর বিকাশে কোনো প্রভাব ফেলে না। শুধুমাত্র মা অনুভব করতে দেরি করেন।
গর্ভাবস্থায় অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টায় কীভাবে যত্ন নিতে হবে?-
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা থাকলে বাড়তি সতর্কতা ও যত্ন প্রয়োজন হয় না, তবে কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি:
- ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত চেকআপ করুন।
- শিশুর নড়াচড়া লক্ষ্য করুন। প্রতিদিন কতবার নড়াচড়া অনুভব করছেন তা লিখে রাখুন।
- রক্তপাত বা পেটব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারকে জানান।
- ভারী ব্যায়াম বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলুন।
- যথেষ্ট বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন।
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা এবং নরমাল ডেলিভারি-
অধিকাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা থাকলেও নরমাল ডেলিভারি সম্ভব। তবে যদি প্লাসেন্টা নিচের দিকে নেমে আসে (placenta previa) বা জরায়ু-মুখ ঢেকে রাখে, তখন সিজারিয়ান প্রয়োজন হতে পারে।
তাই শেষ ট্রাইমেস্টারে আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে প্লাসেন্টার অবস্থান পুনরায় পরীক্ষা করা হয়।
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা কি শিশুর জন্য বিপজ্জনক?-
না, অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা সাধারণত শিশুর জন্য বিপজ্জনক নয়। এটি শুধুমাত্র প্লাসেন্টার অবস্থান নির্দেশ করে। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি জরায়ুর নিচের দিকে না নামে এবং রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক থাকে, ততক্ষণ শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে কোনো সমস্যা হয় না।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি?-
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা থাকলে নিচের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে:
- যোনিপথে রক্তপাত
- তীব্র পেটব্যথা বা চাপ অনুভব
- শিশুর নড়াচড়া হঠাৎ কমে যাওয়া
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা মাথা ঘোরা
এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করবেন।
সংক্ষেপে-
অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা একটি স্বাভাবিক অবস্থা যেখানে প্লাসেন্টা গর্ভাশয়ের সামনের দেয়ালে অবস্থান করে। এটি মা বা শিশুর জন্য সাধারণত ক্ষতিকর নয়। নিয়মিত চেকআপ, শিশুর নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ, এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললেই গর্ভাবস্থা নিরাপদ ও সুস্থ রাখা সম্ভব।
প্রশ্নোত্তর-
১. অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা কি খুব বিপজ্জনক?
না, এটি সাধারণত বিপজ্জনক নয়। অধিকাংশ মা সম্পূর্ণ সুস্থভাবে সন্তান জন্ম দেন।
২.অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা থাকলে কি শিশুর লাথি দেরিতে টের পাওয়া যায়?
হ্যাঁ, প্লাসেন্টা সামনের দিকে থাকায় কিক বা নড়াচড়া কিছুটা দেরিতে অনুভূত হতে পারে।
৩. অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা থাকলে কি সিজারিয়ান বাধ্যতামূলক?
না, সবসময় নয়। শুধুমাত্র যদি প্লাসেন্টা নিচের দিকে নেমে যায় (placenta previa) তখন সিজারিয়ান প্রয়োজন হয়।
৪. অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা কি শিশুর অবস্থানে প্রভাব ফেলে?
কিছু ক্ষেত্রে শিশুর মাথা নিচের দিকে ঘুরতে (head down) সামান্য সময় লাগতে পারে, তবে এটি স্বাভাবিকভাবে ঠিক হয়ে যায়।
৫. অ্যান্টেরিয়র প্লাসেন্টা কি পরবর্তী গর্ভধারণে সমস্যা সৃষ্টি করে?
না, সাধারণত কোনো প্রভাব ফেলে না। পরবর্তী গর্ভধারণেও এটি স্বাভাবিকভাবে হতে পারে বা নাও হতে পারে।





