গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড: কেন এটি অপরিহার্য-
গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড বা ফোলেট হলো একধরনের বি-ভিটামিন (ভিটামিন বি৯), যা মায়ের শরীর ও শিশুর মস্তিষ্কের সুস্থ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই ফলিক এসিড গ্রহণ করলে শিশুর স্নায়ুতন্ত্র গঠনে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সাহায্য করে। বিশেষ করে, এটি শিশুর নিউরাল টিউব ডিফেক্ট (Neural Tube Defects – NTDs) প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে, যা মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
ফলিক এসিড কীভাবে কাজ করে-
ফলিক এসিড শরীরের কোষ বিভাজন, নতুন রক্তকণিকা তৈরি এবং ডিএনএ গঠনে সহায়তা করে। গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে কোষ বিভাজনের হার বেড়ে যায়, তাই ফলিক এসিডের প্রয়োজনও বৃদ্ধি পায়।
এটি শিশুর মস্তিষ্ক, স্পাইনাল কর্ড ও স্নায়ুতন্ত্রের গঠনকে সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করে।
গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিডের উপকারিতা-
গর্ভবতী মায়েদের জন্য ফলিক এসিডের অনেক উপকারিতা রয়েছে। নিচে এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো—
- নিউরাল টিউব ডিফেক্ট প্রতিরোধ: ফলিক এসিড শিশুর মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডে জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করে।
- রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ: এটি রক্তে নতুন লোহিত কণিকা তৈরি করে, ফলে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি কমে।
- গর্ভপাতের ঝুঁকি কমানো: পর্যাপ্ত ফলিক এসিড গ্রহণ করলে গর্ভপাতের সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
- শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা: ফলিক এসিড শিশুর মস্তিষ্ক ও নার্ভাস সিস্টেমের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- মায়ের ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করা: ফলিক এসিড মা’কে শারীরিকভাবে আরও শক্তিশালী রাখে।
গর্ভাবস্থায় কত পরিমাণ ফলিক এসিড প্রয়োজন-
বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থার আগে ও প্রথম তিন মাসে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৮০০ মাইক্রোগ্রাম (mcg) ফলিক এসিড গ্রহণ করা উচিত।
যদি কারো পরিবারের ইতিহাসে নিউরাল টিউব ডিফেক্ট থাকে, তবে ডাক্তার বিশেষভাবে আরও বেশি মাত্রা পরামর্শ দিতে পারেন।
কখন ফলিক এসিড খাওয়া শুরু করা উচিত-
গর্ভাবস্থা পরিকল্পনা করার আগেই ফলিক এসিড খাওয়া শুরু করা সবচেয়ে ভালো। কারণ গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই শিশুর স্নায়ুতন্ত্র তৈরি হয়।
যদি কেউ গর্ভধারণের পর জানতে পারেন, তখনই ফলিক এসিড খাওয়া শুরু করতে হবে এবং পুরো প্রথম ত্রৈমাসিক (প্রথম ৩ মাস) ধরে চালিয়ে যেতে হবে।
ফলিক এসিডের প্রাকৃতিক খাদ্য উৎস-
যদিও ফলিক এসিড ট্যাবলেটের মাধ্যমে নেওয়া সহজ, তবুও খাদ্য থেকে এটি পাওয়া যায়। নিচে কিছু প্রাকৃতিক খাদ্যের তালিকা দেওয়া হলো যা ফলিক এসিডে সমৃদ্ধ—
- পালং শাক, কলমি শাক, লাল শাক
- ডাল, মটরশুঁটি, ছোলা
- কমলা, লেবু ও অন্যান্য সাইট্রাস ফল
- ব্রকলি, বাঁধাকপি
- কলা, পেঁপে
- গমের তৈরি খাবার (হোল গ্রেইন ব্রেড, পাস্তা)
- যকৃত (লিভার)
তবে গর্ভাবস্থায় লিভার বেশি খাওয়া ঠিক নয়, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাওয়া উচিত।
ফলিক এসিডের অভাবের লক্ষণ-
যদি শরীরে ফলিক এসিডের ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে—
- অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা
- রক্তস্বল্পতা
- মনোযোগে ঘাটতি বা স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া
- ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
- মুখে ঘা হওয়া
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড ট্যাবলেট কিভাবে গ্রহণ করবেন-
সাধারণত সকালে নাশতার পর এক গ্লাস পানির সাথে ফলিক এসিড ট্যাবলেট খাওয়া হয়। খালি পেটে না খাওয়াই ভালো।
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ও নির্দিষ্ট মাত্রায় এটি গ্রহণ করা জরুরি।
অতিরিক্ত ফলিক এসিড গ্রহণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া-
যদিও ফলিক এসিড খুবই নিরাপদ, কিন্তু অতিরিক্ত গ্রহণ করলে কিছু সমস্যা হতে পারে যেমন—
- পেট ফাঁপা
- বমিভাব
- ঘুম ঘুম ভাব
- ত্বকে র্যাশ
তবে এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো খুবই বিরল এবং সাধারণত ওষুধের মাত্রা ঠিক রাখলে কোনো সমস্যা হয় না।
ফলিক এসিড ও ভিটামিন বি১২ এর সম্পর্ক-
ফলিক এসিড ও ভিটামিন বি১২ একসাথে শরীরের জন্য কাজ করে। যদি শুধু ফলিক এসিড নেওয়া হয় কিন্তু বি১২ এর ঘাটতি থাকে, তাহলে রক্তে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই অনেক সময় চিকিৎসক ফলিক এসিডের সাথে ভিটামিন বি১২ সম্পূরকও দেন।
উপসংহার-
গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড একটি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান যা মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। এটি শুধুমাত্র জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করে না, বরং মায়ের শরীরকে সুস্থ ও শক্তিশালী রাখে। তাই গর্ভধারণের আগে থেকেই ফলিক এসিড গ্রহণ শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ও নিয়মিতভাবে এটি গ্রহণ করলে মা ও শিশুর জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব।
গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন-
প্রশ্ন ১: গর্ভাবস্থায় ফলিক এসিড কখন থেকে খাওয়া শুরু করা উচিত?
উত্তর: গর্ভধারণের আগেই ফলিক এসিড খাওয়া শুরু করা সবচেয়ে ভালো। যদি আগে থেকে শুরু না করা যায়, তবে গর্ভধারণ জানার পরপরই খাওয়া শুরু করতে হবে।
প্রশ্ন ২: প্রতিদিন কত ফলিক এসিড খাওয়া উচিত?
উত্তর: প্রতিদিন ৪০০–৮০০ মাইক্রোগ্রাম (mcg) ফলিক এসিড যথেষ্ট, তবে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
প্রশ্ন ৩: কোন খাবারে ফলিক এসিড বেশি থাকে?
উত্তর: সবুজ শাকসবজি, ডাল, কমলা, লেবু, কলা, ব্রকলি ও হোলগ্রেইন খাবারে ফলিক এসিড বেশি পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৪: ফলিক এসিড ট্যাবলেট খেলে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় কি?
উত্তর: খুবই বিরল ক্ষেত্রে হালকা পেট ফাঁপা, বমিভাব বা ত্বকে র্যাশ হতে পারে। তবে সাধারণত এটি নিরাপদ।
প্রশ্ন ৫: ফলিক এসিড কি গর্ভবতী না হলেও খাওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করা নারীরা ফলিক এসিড খেতে পারেন, এটি ভবিষ্যৎ গর্ভাবস্থার জন্য প্রস্তুতি নেয়।





