প্রসবজনিত ফিস্টুলা কী?-
প্রসবজনিত ফিস্টুলা হলো এমন একটি স্বাস্থ্য সমস্যা যেখানে প্রসবকালীন জটিলতার কারণে মূত্রথলি (Bladder) ও যোনি (Vagina) অথবা মলদ্বার (Rectum) ও যোনির মাঝে অস্বাভাবিক একটি ছিদ্র তৈরি হয়। এর ফলে প্রস্রাব বা মল অনিচ্ছাকৃতভাবে যোনি দিয়ে বের হতে থাকে।
এই সমস্যা সাধারণত দীর্ঘক্ষণ বাধাগ্রস্ত প্রসবের (Obstructed Labor) কারণে হয়, যখন শিশুর মাথা জন্মপথে আটকে যায় এবং আশেপাশের টিস্যুতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে টিস্যু মারা যায়।
প্রসবজনিত ফিস্টুলার কারণ-
প্রসবজনিত ফিস্টুলা সাধারণত নিম্নলিখিত কারণগুলো থেকে হয়ে থাকে—
- দীর্ঘসময় ধরে প্রসববেদনা: প্রসবের সময় শিশুর মাথা বা শরীর জন্মপথে আটকে গেলে টিস্যুর ক্ষতি হয়।
- দক্ষ প্রসবসেবা না পাওয়া: অনেক নারী পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে বাড়িতে বা অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব করেন।
- কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ: অপরিণত পেলভিসের কারণে জন্মপথ সংকীর্ণ থাকে, যা ফিস্টুলার ঝুঁকি বাড়ায়।
- সিজারিয়ান বা অপারেশনের জটিলতা: ভুলভাবে করা অপারেশনেও ফিস্টুলা তৈরি হতে পারে।
- প্রসবকালীন যন্ত্রপাতির ভুল ব্যবহার: অভিজ্ঞতাহীন হাতে প্রসবের সময় যন্ত্রপাতি ব্যবহারেও টিস্যু ছিঁড়ে যেতে পারে।
প্রসবজনিত ফিস্টুলার উপসর্গ-
এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ ও বিব্রতকর উপসর্গ হলো যোনি দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মূত্র বা মল বের হওয়া।
এছাড়াও অন্যান্য উপসর্গগুলো হলো—
- প্রস্রাবের দুর্গন্ধযুক্ত নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ
- যোনি ও আশেপাশের ত্বক ঘা হয়ে যাওয়া
- তলপেটে বা পিঠে ব্যথা
- বারবার মূত্রনালী সংক্রমণ (UTI)
- মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অনিয়ম
- মানসিক অস্বস্তি, লজ্জা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা কীভাবে হয়?-
দীর্ঘসময় বাধাগ্রস্ত প্রসব হলে শিশুর মাথা জন্মপথের ভেতরে আটকে যায়। এই অবস্থায় রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে টিস্যু মারা যায় এবং মূত্রথলি ও যোনির মাঝে ছিদ্র তৈরি হয়।
শিশুটি সাধারণত মৃত অবস্থায় জন্মায় এবং মা এই ভয়াবহ জটিলতায় ভোগেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৫০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ নারী নতুনভাবে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্ত হন, যার বেশিরভাগই উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ঘটে।
প্রসবজনিত ফিস্টুলার প্রভাব-
প্রসবজনিত ফিস্টুলা শুধুমাত্র শারীরিক নয়, এটি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও নারীর জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
- শারীরিক প্রভাব: প্রস্রাবের গন্ধ, সংক্রমণ, ঘা, দুর্বলতা ও রক্তস্বল্পতা
- মানসিক প্রভাব: লজ্জা, হতাশা ও আত্মসম্মানবোধের অভাব
- সামাজিক প্রভাব: পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা, বিবাহ বিচ্ছেদ বা পরিত্যাগ
প্রসবজনিত ফিস্টুলার চিকিৎসা-
প্রসবজনিত ফিস্টুলা সারানো সম্ভব। সঠিক চিকিৎসা ও সময়মতো অপারেশন করলে নারী সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন ফিরে পেতে পারেন। নিচে চিকিৎসার প্রধান পদ্ধতিগুলো দেওয়া হলো—
- সার্জারি বা অস্ত্রোপচার: ফিস্টুলার ছিদ্র বন্ধ করার জন্য বিশেষ সার্জারি করা হয়, যাকে “Fistula Repair Surgery” বলা হয়।
- ক্যাথেটার থেরাপি: ছোট ফিস্টুলার ক্ষেত্রে প্রস্রাবের নালীতে কিছুদিন ক্যাথেটার রাখলে স্বাভাবিকভাবে ছিদ্র বন্ধ হতে পারে।
- সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ: অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করে ইনফেকশন দূর করা হয়।
- পুষ্টিকর খাদ্য ও বিশ্রাম: শরীর দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
- মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা: অনেক নারী মানসিক ট্রমায় ভোগেন, তাই কাউন্সেলিং প্রয়োজন।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা প্রতিরোধের উপায়-
প্রসবজনিত ফিস্টুলা সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। নিচে এর প্রতিরোধের কয়েকটি কার্যকর উপায় দেওয়া হলো—
- সঠিক সময়ে চিকিৎসা গ্রহণ: প্রসবের সময় দক্ষ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান থাকা জরুরি।
- প্রসবকালীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা: প্রত্যন্ত এলাকায়ও প্রশিক্ষিত ধাত্রী বা মিডওয়াইফ থাকা উচিত।
- কিশোরী বিবাহ রোধ: মেয়েদের পরিণত বয়সে গর্ভধারণে উৎসাহিত করতে হবে।
- প্রসবপূর্ব চেকআপ করা: শিশুর অবস্থান ও মায়ের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
- জনসচেতনতা বৃদ্ধি: নারীদের ফিস্টুলা সম্পর্কে সচেতন করা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট-
বাংলাদেশে গ্রামীণ এলাকায় এখনো অনেক নারী বাড়িতে বা অদক্ষ ধাত্রীর সহায়তায় সন্তান জন্ম দেন। ফলে প্রসবকালীন জটিলতা বাড়ে এবং প্রসবজনিত ফিস্টুলা হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা যেমন—UNFPA, BRAC, এবং Fistula Foundation—এ বিষয়ে কাজ করছে। দেশে বর্তমানে বিনামূল্যে ফিস্টুলা সার্জারি ও পুনর্বাসন কেন্দ্রও রয়েছে, যা নারীদের নতুন জীবন ফিরিয়ে দিচ্ছে।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা সম্পর্কে ভুল ধারণা-
অনেক সময় নারীরা মনে করেন ফিস্টুলা কোনো অভিশাপ বা শাস্তি। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা।
এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য শারীরিক সমস্যা, যা সময়মতো চিকিৎসা পেলে পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব।
উপসংহার-
প্রসবজনিত ফিস্টুলা একটি প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ, কিন্তু এটি এখনও অনেক নারীর জীবনে দুর্ভোগের কারণ হয়ে আছে। সচেতনতা, সময়মতো চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে এই রোগের ভয়াবহতা রোধ করা সম্ভব।
প্রতিটি নারী যেন নিরাপদ প্রসব সেবা পান, সেটিই হতে পারে ফিস্টুলামুক্ত ভবিষ্যতের প্রথম পদক্ষেপ।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন-
প্রশ্ন ১: প্রসবজনিত ফিস্টুলা কীভাবে হয়?
উত্তর: দীর্ঘসময় বাধাগ্রস্ত প্রসব, কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ, ও চিকিৎসা বিলম্বের কারণে যোনি ও মূত্রথলির মাঝে ছিদ্র তৈরি হয়।
প্রশ্ন ২: প্রসবজনিত ফিস্টুলা কি সারানো সম্ভব?
উত্তর: হ্যাঁ, সঠিক অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসা পেলে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন ৩: এই রোগ প্রতিরোধ করা যায় কিভাবে?
উত্তর: দক্ষ প্রসবসেবা, সময়মতো হাসপাতালে যাওয়া, এবং কিশোরী বয়সে গর্ভধারণ এড়িয়ে চলার মাধ্যমে ফিস্টুলা প্রতিরোধ করা যায়।
প্রশ্ন ৪: প্রসবজনিত ফিস্টুলার পর নারী কি আবার সন্তান জন্ম দিতে পারেন?
উত্তর: চিকিৎসা ও সার্জারির পর অনেক নারী পরবর্তী গর্ভাবস্থায় সফলভাবে সন্তান জন্ম দিতে পারেন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রশ্ন ৫: ফিস্টুলা হলে কোথায় চিকিৎসা পাওয়া যায়?
উত্তর: বাংলাদেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কুড়িগ্রাম, যশোর ও রাজশাহীতে বিনামূল্যে ফিস্টুলা চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে।





