মায়ের ত্যাগ ও সন্তানের দায়িত্ব

মায়ের ত্যাগ ও সন্তানের দায়িত্ব: কুরআনের আলোকে – ইসলামের দৃষ্টিতে মায়ের মর্যাদা ও সন্তানদের কর্তব্য

মায়ের ত্যাগ ও সন্তানের দায়িত্ব কুরআনের আলোকে: ভূমিকা-

মায়ের ত্যাগ পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নাম। একজন মা নিজের আরাম, স্বপ্ন, সময়—সবকিছু বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্য জীবন গড়ে তোলেন। ইসলাম এই ত্যাগকে শুধু মানবিক অনুভূতি হিসেবে নয়, বরং ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। মায়ের ত্যাগ ও সন্তানের দায়িত্ব কুরআনের আলোকে বুঝতে পারলে আমরা উপলব্ধি করতে পারি—মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন শুধু সামাজিক কর্তব্য নয়, বরং এটি আল্লাহর নির্দেশ।

কুরআনে মায়ের মর্যাদা-

আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন বহু আয়াতে। বিশেষভাবে মায়ের কষ্টের কথা আলাদা করে উল্লেখ করেছেন।

সূরা লুকমানের নির্দেশনা

সূরা লুকমান-এ আল্লাহ বলেন:

“আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেছে…”

এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে মায়ের কষ্টের কথা উল্লেখ করেছেন—গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও দুধপান করানো—সবই একের পর এক ত্যাগের অধ্যায়।

সূরা আল-ইসরা: সম্মানের সর্বোচ্চ নির্দেশ-

সূরা আল-ইসরা-এর ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

“তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ শব্দটিও বলো না।”

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়—মায়ের প্রতি বিরক্তির সামান্য প্রকাশও ইসলাম সমর্থন করে না।

মায়ের ত্যাগের ধাপসমূহ-

১. গর্ভধারণের কষ্ট- একজন মা ৯ মাস গর্ভে সন্তান ধারণ করেন। শারীরিক কষ্ট, মানসিক চাপ—সব সহ্য করেন শুধু সন্তানের জন্য।

২. প্রসব বেদনা- প্রসবের সময় একজন মা মৃত্যুর মুখোমুখি হন। তবুও সন্তানের মুখ দেখার জন্য সব যন্ত্রণা সহ্য করেন।

৩. লালন-পালন- রাত জেগে থাকা, নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দেওয়া—এসবই মায়ের প্রতিদিনের জীবন।

৪. দোয়া ও মানসিক সমর্থন- মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী আশীর্বাদ।

হাদীসে মায়ের মর্যাদা-

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“তোমার উত্তম আচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে?”
তিনি বললেন: “তোমার মা।”
সাহাবি জিজ্ঞেস করলেন: “তারপর কে?”
তিনি বললেন: “তোমার মা।”
আবার জিজ্ঞেস করলে বললেন: “তোমার মা।”
তারপর বললেন: “তোমার বাবা।”

— সহিহ বুখারি

এখানে তিনবার “মা” উল্লেখ করে মায়ের মর্যাদা কত উচ্চ তা বোঝানো হয়েছে।

 

আরেকটি বিখ্যাত হাদীসে এসেছে:

“জান্নাত তোমার মায়ের পায়ের নিচে।”

— সুনান আন-নাসাঈ

অর্থাৎ মায়ের সন্তুষ্টি অর্জন করাই জান্নাতের পথ সুগম করে।

সন্তানের দায়িত্ব কুরআনের আলোকে-

১. সম্মান ও বিনয় প্রদর্শন- মায়ের সামনে উচ্চস্বরে কথা বলা বা অসম্মান করা হারামসদৃশ আচরণ।

২. বার্ধক্যে সেবা করা- বয়স হলে মা সন্তানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তখন তার সেবা করা সন্তানের ফরজ দায়িত্ব।

৩. দোয়া করা- কুরআনে শেখানো হয়েছে:

“হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।”

— সূরা আল-ইসরা

৪. আর্থিক সহায়তা- মা অভাবগ্রস্ত হলে সন্তানের দায়িত্ব তাকে সহযোগিতা করা।

৫. মৃত্যুর পরও দায়িত্ব- মায়ের জন্য দোয়া, সদকা ও ইসালে সওয়াব করা সন্তানের কর্তব্য।

মায়ের অবাধ্যতার পরিণতি-

ইসলামে “উকূকুল ওয়ালিদাইন” অর্থাৎ পিতা-মাতার অবাধ্যতা বড় গুনাহ। রাসূল ﷺ এটিকে কবিরা গুনাহর মধ্যে গণ্য করেছেন।

মায়ের কষ্ট দেওয়া বা অবজ্ঞা করা দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ শাস্তির কারণ হতে পারে।

কেন আল্লাহ মায়ের কথা আলাদা করে বলেছেন?-

কারণ—

  • মা সন্তানের জন্য নিঃস্বার্থ
  • মা সন্তানের সুখে হাসেন, দুঃখে কাঁদেন
  • মা বিনিময় আশা করেন না

তাই কুরআনে মায়ের ত্যাগ বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমান সমাজে আমাদের দায়িত্ব-

আজ অনেক মা বৃদ্ধাশ্রমে, অবহেলিত, একাকী জীবনযাপন করছেন। এটি ইসলামের শিক্ষা পরিপন্থী। মায়ের ত্যাগ ও সন্তানের দায়িত্ব কুরআনের আলোকে বুঝলে আমরা কখনো মাকে অবহেলা করতে পারি না।

আখিরাতে মায়ের মর্যাদা-

একজন সন্তুষ্ট মা সন্তানের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ হতে পারেন। আর অসন্তুষ্ট মা সন্তানের জন্য আখিরাতে কঠিন হিসাবের কারণ হতে পারেন। তাছাড়া মাকে অবহেলা করলে তার পরিণতি শুধু আখিরাত নয় বরং দুনিয়াবী জীবনে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

উপসংহার-

মায়ের ত্যাগ ও সন্তানের দায়িত্ব কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি—মায়ের মর্যাদা আল্লাহর পরে সর্বোচ্চ। তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনই সন্তানের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার চাবিকাঠি। মায়ের হাসি যেন আমাদের জান্নাতের আলো হয়। মায়ের দোয়া যেন আমাদের জীবনের বরকত হয়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে মায়ের যথাযথ হক আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

সাধারণ প্রশ্নত্তোর-

১. কুরআনে মায়ের ত্যাগ কোথায় উল্লেখ আছে?

সূরা লুকমান-এ মায়ের গর্ভধারণের কষ্টের কথা বলা হয়েছে।

২. মায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মানের হাদীস কোনটি?

সহিহ বুখারি-তে তিনবার “মা” উল্লেখ করা হয়েছে।

৩. মায়ের জন্য দোয়া কোন আয়াতে আছে?

সূরা আল-ইসরা-এর আয়াতে দোয়া শেখানো হয়েছে।

৪. মায়ের অবাধ্যতা কি বড় গুনাহ?

হ্যাঁ, এটি কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য।

৫. মৃত্যুর পর মায়ের জন্য কী করা উচিত?

দোয়া, সদকা, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
Scroll to Top