শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশল

শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশল: সুস্থ মানসিক বিকাশের কার্যকর উপায়

শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশল: ভূমিকা-

শিশু শুধু আমাদের দায়িত্ব নয়, সে আমাদের অনুভূতির অংশ। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশল জানা থাকলে সন্তান শুধু বাধ্য নয়, হয়ে ওঠে আত্মবিশ্বাসী, খোলামেলা ও মানসিকভাবে সুস্থ একজন মানুষ। আধুনিক প্যারেন্টিংয়ে শাসনের চেয়ে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কারণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই শিশুর মনে নিরাপত্তা ও বিশ্বাস তৈরি করে। এই লেখায় আমরা জানব কীভাবে বাস্তব জীবনে শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়।

শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক কেন জরুরি-

শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশল অনুসরণ করলে শিশুর মানসিক বিকাশ স্বাভাবিক হয়। শিশু তার ভয়, আনন্দ, কষ্ট কিংবা ভুল নির্দ্বিধায় বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাগ করতে শেখে। এতে শিশুর আচরণগত সমস্যা কমে, আত্মসম্মান বাড়ে এবং ভবিষ্যতে সে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্থ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা-

শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। শিশুর কথা মাঝপথে থামানো, অবহেলা করা বা তুচ্ছ করা হলে সে নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করে। বরং চোখের দিকে তাকিয়ে, ধৈর্য ধরে তার কথা শুনলে শিশু বুঝতে পারে সে গুরুত্বপূর্ণ।

শাসনের বদলে বোঝানোর অভ্যাস গড়া-

অতিরিক্ত শাসন শিশুকে ভীত করে তোলে, কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে না। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশল হিসেবে শাস্তির পরিবর্তে ভুলের কারণ ব্যাখ্যা করা জরুরি। এতে শিশু ভয় নয়, যুক্তি দিয়ে সঠিক কাজ শেখে।

শিশুর অনুভূতিকে সম্মান করা-

শিশু কাঁদলে বা রাগ করলে অনেক সময় বড়রা বলেন, “এতে কাঁদার কী আছে?”—এই কথাগুলো শিশুর অনুভূতিকে অবমূল্যায়ন করে। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে হলে তার অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে সে বুঝবে তার আবেগ মূল্যবান।

শিশুর সঙ্গে সময় কাটানো-

সময় দেওয়া মানেই শুধু পাশে বসে থাকা নয়, বরং মানসম্মত সময় কাটানো। শিশুর সঙ্গে গল্প করা, খেলাধুলা করা, পড়াশোনায় সহযোগিতা করা—এসবই শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কার্যকর কৌশল। নিয়মিত সময় দিলে শিশুর মনে ভালোবাসা ও বিশ্বাস তৈরি হয়।

শিশুকে নিজের মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া-

শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশলের অন্যতম দিক হলো সিদ্ধান্তে শিশুর মতামত নেওয়া। পোশাক নির্বাচন, খেলনা কেনা বা ছোট সিদ্ধান্তে শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দিলে সে নিজেকে মূল্যবান মনে করে।

ভুল করলে শিশুকে ভয় না দেখানো-

ভুল করা শেখারই একটি অংশ। শিশুর ভুলে রাগ বা ভয় দেখালে সে সত্য লুকাতে শেখে। বরং শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ভুলের পর তাকে শেখানোর মানসিকতা থাকতে হবে।

নিজের আচরণে উদাহরণ তৈরি করা-

শিশু কথা থেকে বেশি শেখে আচরণ দেখে। আপনি যদি সম্মান, ধৈর্য ও সততার উদাহরণ তৈরি করেন, শিশুও তা অনুসরণ করবে। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশলে নিজের আচরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিশুকে নিঃশর্ত ভালোবাসা দেওয়া-

শিশু যেন বুঝতে পারে—তার ভালোবাসা অর্জনের জন্য কোনো শর্ত নেই। ভালো ফলাফল, ভালো আচরণ কিংবা সফলতার ওপর ভালোবাসা নির্ভর করলে শিশুর মানসিক চাপ বাড়ে। নিঃশর্ত ভালোবাসাই শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তি।

প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সচেতন হওয়া-

বর্তমান সময়ে শিশু ও অভিভাবক উভয়ই প্রযুক্তিতে আসক্ত। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে হলে মোবাইল বা টিভির বাইরে এসে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে হবে। এতে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হয়।

শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে সহায়তা করা-

শিশুকে তার সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস করতে শেখানো খুব জরুরি। ছোট অর্জনেও প্রশংসা করলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আত্মবিশ্বাসী শিশু পরিবারে ও সমাজে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে।

উপসংহার-

শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার কৌশল অনুসরণ করা মানে শিশুর ভবিষ্যৎকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা। ভালোবাসা, সময়, ধৈর্য ও সম্মান—এই চারটি বিষয়ই একটি সুস্থ সম্পর্কের মূল ভিত্তি। আজকের ছোট আচরণই আগামী দিনের শিশুর মানসিক শক্তি হয়ে উঠবে।

প্রশ্নোত্তর-

১. শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার সবচেয়ে সহজ উপায় কী?
শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো নিয়মিত তার কথা মন দিয়ে শোনা এবং তার অনুভূতিকে সম্মান করা। এতে শিশু নিজেকে নিরাপদ ও মূল্যবান মনে করে।

২. শাসন ছাড়া কি শিশুকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?
হ্যাঁ, সম্ভব। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে ভয় দেখানোর প্রয়োজন হয় না। বোঝানো ও ভালোবাসার মাধ্যমেই শিশু সঠিক আচরণ শিখে।

৩. ব্যস্ত বাবা-মায়ের জন্য এই সম্পর্ক বজায় রাখা কি কঠিন?
ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন কিছু মানসম্মত সময় বের করা সম্ভব। অল্প সময় হলেও যদি মনোযোগসহ দেওয়া যায়, তবে শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকে।

৪. শিশু কথা বলতে না চাইলে কী করা উচিত?
জোর না করে ধৈর্য ধরতে হবে। শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে সে নিজেই সময় নিয়ে কথা বলবে। নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাই এখানে মূল বিষয়।

৫. এই সম্পর্ক শিশুর ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলে?
শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে সে ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল ও মানসিকভাবে শক্ত মানুষ হয়ে ওঠে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
Scroll to Top