শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায়: ভূমিকা-
শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ঘুম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক অভিভাবকই অভিযোগ করেন—শিশু রাতে ঘুমাতে চায় না, দেরি করে ঘুমায়, মাঝরাতে বারবার জেগে ওঠে বা সকালে উঠতে চায় না। এসব সমস্যার মূল কারণ বেশিরভাগ সময়ই একটি সঠিক ও নিয়মিত ঘুমের রুটিনের অভাব। তাই শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায় জানা প্রতিটি বাবা-মায়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
এই ব্লগে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব—কেন ঘুমের রুটিন গুরুত্বপূর্ণ, বয়সভেদে শিশুর ঘুমের চাহিদা, ধাপে ধাপে রুটিন তৈরির কৌশল, সাধারণ ভুল এবং কার্যকর সমাধান।
শিশুদের ঘুমের রুটিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ-
ঘুম শুধু বিশ্রাম নয়, এটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, স্মৃতিশক্তি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। নিয়মিত ঘুমের রুটিন থাকলে শিশু নিরাপদ বোধ করে এবং তার শরীরের “বায়োলজিক্যাল ক্লক” ঠিকভাবে কাজ করে।
নিয়মিত ঘুমের উপকারিতা-
- শিশুর মনোযোগ ও শেখার ক্ষমতা বাড়ে
- রাগ, জেদ ও অস্থিরতা কমে
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয়
- বাবা-মায়ের মানসিক চাপ কমে
বয়সভেদে শিশুদের ঘুমের প্রয়োজন-
শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায় বুঝতে হলে আগে জানতে হবে—কোন বয়সে কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
বয়স ────────────── প্রয়োজনীয় ঘুম (প্রতিদিন)
০–১ বছর ────────── ১৪–১৭ ঘণ্টা
১–৩ বছর ────────── ১২–১৪ ঘণ্টা
৩–৫ বছর ────────── ১০–১৩ ঘণ্টা
৬–১২ বছর ───────── ৯–১১ ঘণ্টা
এই সময়ের মধ্যে রাতের ঘুম ও দিনের ঘুম (nap) দুটোই অন্তর্ভুক্ত।
শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায়: ধাপে ধাপে গাইড-
১. নির্দিষ্ট ঘুমানোর সময় ঠিক করুন
প্রতিদিন একই সময়ে শিশুকে ঘুমাতে পাঠানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ছুটির দিনেও সময় খুব বেশি পরিবর্তন করা উচিত নয়। এতে শিশুর শরীর নিজে থেকেই ঘুমের জন্য প্রস্তুত হয়।
২. ঘুমের আগে একটি নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করুন
ঘুমের আগে একই কাজ প্রতিদিন করলে শিশুর মস্তিষ্ক বুঝে নেয়—এখন ঘুমানোর সময়।
রাতের রুটিন উদাহরণ:
খাওয়া → হালকা গল্প → দাঁত ব্রাশ → দোয়া → ঘুম
এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই হলো শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায়-এর মূল চাবিকাঠি।
৩. স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করুন
মোবাইল, ট্যাব বা টিভির নীল আলো শিশুর ঘুমের হরমোন (Melatonin) নষ্ট করে দেয়।
ঘুমের অন্তত ১ ঘণ্টা আগে সব স্ক্রিন বন্ধ রাখুন।
৪. ঘুমানোর পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক করুন
- আলো কম রাখুন
- শব্দ কমান
- আরামদায়ক বিছানা ব্যবহার করুন
- অতিরিক্ত খেলনা সরিয়ে ফেলুন
একটি শান্ত পরিবেশ শিশুকে দ্রুত ও গভীর ঘুমে যেতে সাহায্য করে।
৫. দিনের রুটিন ঠিক রাখুন
শুধু রাত নয়, দিনের অভ্যাসও শিশুর ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে।
- দিনে পর্যাপ্ত খেলাধুলা
- নির্দিষ্ট সময়ের খাবার
- অতিরিক্ত দিনের ঘুম এড়িয়ে চলা
এসব বিষয় রাতের ঘুমকে সহজ করে তোলে।
৬. ঘুমের আগে ভয় বা দুশ্চিন্তা দূর করুন-
অনেক শিশু অন্ধকার, একা থাকা বা দুঃস্বপ্নের ভয় পায়। ঘুমের আগে শিশুর সঙ্গে কথা বলুন, তার ভয়গুলো মনোযোগ দিয়ে শুনুন। এতে শিশুর মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়।
শিশুদের ঘুমের রুটিনে সাধারণ ভুল-
অনেক সময় চেষ্টা করার পরও রুটিন কাজ করে না, কারণ কিছু সাধারণ ভুল হয়ে যায়।
- প্রতিদিন ঘুমানোর সময় পরিবর্তন করা
- ঘুমের আগে উত্তেজক খেলা বা কার্টুন
- ঘুমের সময় বকাঝকা করা
- একদিন নিয়ম, পরদিন নিয়ম ভাঙা
মনে রাখবেন: শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায় সফল করতে হলে ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা সবচেয়ে জরুরি।
শিশু যদি রাতে ঘুমাতে না চায়, কী করবেন?-
- জোর করবেন না
- শান্ত স্বরে কথা বলুন
- আলো নিভিয়ে দিন
- পাশে বসে গল্প বা দোয়া পড়ুন
- একই নিয়ম বারবার অনুসরণ করুন
২–৩ সপ্তাহ নিয়ম মেনে চললে বেশিরভাগ শিশুই নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
বাবা-মায়ের ভূমিকা কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-
শিশু আপনাকে অনুসরণ করে। আপনি যদি রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার করেন, শিশুও সেটাই শিখবে। তাই নিজেও ঘুমের সময় মেনে চলা জরুরি। পরিবারের সবাই একসঙ্গে চেষ্টা করলে শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায় অনেক সহজ হয়ে যায়।
উপসংহার-
শিশুর সুস্থতা, আনন্দ ও ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়—এটি একটি মৌলিক প্রয়োজন। নিয়মিত ও স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে হলে আজই শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায় অনুসরণ শুরু করুন। ধৈর্য রাখুন, ভালোবাসা দিন এবং ধারাবাহিক থাকুন—আপনার শিশুও নিশ্চয়ই শান্ত ও গভীর ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলবে।
শিশুদের ঘুমের রুটিন তৈরি করার উপায় সম্পর্কে প্রশ্নত্তোর-
১. শিশুর ঘুমের রুটিন শুরু করার সঠিক বয়স কোনটি?
জন্মের পর থেকেই ধীরে ধীরে রুটিন শুরু করা যায়। তবে ৬ মাসের পর নিয়মিত রুটিন সবচেয়ে কার্যকর হয়।
২. শিশু রাতে বারবার জেগে উঠলে কী করব?
আলো বা খেলনা না জ্বালিয়ে শান্তভাবে আবার ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করুন। এতে শিশু বুঝবে—জেগে ওঠা মানেই খেলা নয়।
৩. দিনের ঘুম কি বন্ধ করে দেওয়া উচিত?
না। বয়স অনুযায়ী দিনের ঘুম প্রয়োজন। তবে বিকেলের পরে দীর্ঘ ঘুম এড়িয়ে চলুন।
৪. কত দিনে ঘুমের রুটিন কাজ করে?
সাধারণত ২–৩ সপ্তাহ নিয়ম মেনে চললে শিশুর অভ্যাস তৈরি হয়।
৫. শিশু যদি একা ঘুমাতে না চায়?
ধীরে ধীরে অভ্যাস করুন। শুরুতে পাশে বসে থাকুন, পরে দূরত্ব বাড়ান।





